পথশিশুদের স্বপ্নপূরণ: পাঁচতারকা হোটেলে কাজ শুরু মজার ইশকুলের শিক্ষার্থীদের
১৪ বছরের যাত্রায় পথশিশুদের শিক্ষা, দক্ষতা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।




ঢাকা, ৮ মার্চ ২০২৬: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে একসঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যে চুক্তি করেছে Crowne Plaza Dhaka Gulshan ও মজার ইশকুল। প্রাথমিকভাবে মজার ইশকুলের দুটি শাখা থেকে রানি ও ফাতেমা আক্তার মিম নামের দুই শিক্ষার্থী এই সুযোগ পাচ্ছে। আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের আওতা আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের অগোচরে এক সময় যেসব শিশু ফুটপাত, রেলস্টেশন কিংবা বস্তির কঠিন বাস্তবতায় বড় হচ্ছিল, তাদের অনেকেই আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হয়ে উঠেছে শিক্ষক, কেউ কাজ করছে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা হোটেলে, আবার কেউ আতিথেয়তা শিল্পের পেশাদার কর্মী হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একটি সামাজিক উদ্যোগ—মজার ইশকুল।
২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছোট উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা মজার ইশকুল বর্তমানে পথশিশুদের শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। গত ১৪ বছরে সংগঠনটি শুধু শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করেই থেমে থাকেনি; বরং শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, খাদ্য সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে তাদের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো—এক সময় যারা পথে ঘুমাত, ভিক্ষা করত কিংবা ছোটখাটো কাজ করে দিন কাটাত, সেই শিশুরাই আজ পাঁচতারকা হোটেলে পেশাদার কর্মী হিসেবে কাজ করছে।
মজার ইশকুলের প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ান আরিফ বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য কখনোই শুধু শিশুদের বই হাতে তুলে দেওয়া ছিল না। আমরা চেয়েছি তারা যেন জীবনে সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড়াতে পারে। আজ যখন দেখি আমাদের শিক্ষার্থীরা পাঁচতারকা হোটেলে কাজ করছে এবং নিজের পরিবারকে সহায়তা করছে—তখন মনে হয় আমাদের স্বপ্ন বাস্তব হতে শুরু করেছে।”
কার্তি ভিকে (Karthi V.K.), জেনারেল ম্যানেজার, ক্রাউন প্লাজা গুলশান ঢাকা , বলেন—
“আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে ক্রাউন প্লাজা প্রথমবারের মতো নারী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মজার ইশকুলের ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে দুইজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংখ্যা আপাতত ছোট হলেও ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, সহায়তা দেওয়ার চেয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথও তৈরি হবে।”
মজার ইশকুলের শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুয়াকাটা ও ভোলার মনপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা, বই, পোশাক, খাবার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষা, জীবন দক্ষতা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও তৈরি করা হয়।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে একটি মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনের সুযোগ পেয়েছে। যারা এক সময় সমাজের প্রান্তিক অংশ হিসেবে অবহেলিত ছিল, আজ তারা একই সমাজের উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
মজার ইশকুলের কর্মকর্তারা জানান, আগামী দিনে আরও বেশি সংখ্যক শিশুকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। তাদের বিশ্বাস—একজন শিশুর জীবন বদলে গেলে বদলে যেতে পারে একটি পরিবার, আর বহু শিশুর জীবন বদলে গেলে বদলে যেতে পারে পুরো সমাজ।
